ঢাকা ০৬:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খরচ ও ভর্তুকি কমাতে ন্যানো সারের দিকে ঝুঁকছে সরকার

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ১০:১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ সময় দেখুন

বিশ্বজুড়ে সারের সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সারের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমাতে ন্যানো সারের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ন্যানো ফার্টিলাইজার বা ন্যানো সার ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মাটির উর্বরতা রক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে ন্যানো সারের প্রয়োগ বাড়ানো, গবেষণা জোরদার এবং দ্রুত মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তিনি নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও নীতি নির্ধারণের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ন্যানো সার নিয়ে পাইলট প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনও ন্যানো সারের কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্বরান্বিত করতে বিশেষ ‘ন্যানো সেল’ গঠন করেছে।

দেশের সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ন্যানো সারের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী ‘ইফকো ন্যানো ইউরিয়া’ ও ‘এন ব্লু’ সারের ওপর গবেষণা করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত হয়েছে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও গত কয়েক বছর ধরে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সার ব্যবহার বাড়ছে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো কৃষিপ্রধান দেশেও ন্যানো সার ব্যবহার করা হচ্ছে। আফ্রিকার সেনেগাল, কেনিয়া ও উগান্ডায় কম খরচে ফসল উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশেও বেসরকারি পর্যায়ে ন্যানো সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর ধরে ধান, গম, শাকসবজি ও আমসহ বিভিন্ন ফসলের ওপর ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে নিয়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে। এসব পরীক্ষায় কৃষকদের কাছ থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  মার্কিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বৈঠক, বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। ফলে প্রায় ১৬ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই সার কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষকদের কম দামে সার সরবরাহ করতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়।

ন্যানো সারের অন্যতম সুবিধা হিসেবে কম পরিমাণে ব্যবহার করে তুলনামূলক বেশি কার্যকারিতার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৫০০ মিলিলিটারের একটি ন্যানো ইউরিয়ার বোতল ৫০ কেজির এক বস্তা দানাদার ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এতে কৃষকের খরচও কমতে পারে।

বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো সার ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা ও সরকারি ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রতিবেদনে সরকারি ভর্তুকি প্রায় ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  প্রশিক্ষণের সময় তুরস্কে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া এবং জলাশয়ে দূষণ বাড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ন্যানো সার সরাসরি উদ্ভিদের পাতায় শোষিত হওয়ার কারণে সারের অপচয় ও পরিবেশদূষণ কমানো সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গ্যাস-সংকট, আর্থিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশে কখনো কখনো সার উৎপাদন ও আমদানিতে সংকট দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ন্যানো সার আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তবে ন্যানো সার ব্যাপকভাবে বাজারজাত করার আগে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মাঠপর্যায়ের ফলাফল যাচাই এবং যথাযথ সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

Tag :

খরচ ও ভর্তুকি কমাতে ন্যানো সারের দিকে ঝুঁকছে সরকার

আপডেটের সময়: ১০:১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বজুড়ে সারের সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সারের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমাতে ন্যানো সারের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ন্যানো ফার্টিলাইজার বা ন্যানো সার ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মাটির উর্বরতা রক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে ন্যানো সারের প্রয়োগ বাড়ানো, গবেষণা জোরদার এবং দ্রুত মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তিনি নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় ন্যানো ফার্টিলাইজার নিয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও নীতি নির্ধারণের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ন্যানো সার নিয়ে পাইলট প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনও ন্যানো সারের কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্বরান্বিত করতে বিশেষ ‘ন্যানো সেল’ গঠন করেছে।

দেশের সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ন্যানো সারের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী ‘ইফকো ন্যানো ইউরিয়া’ ও ‘এন ব্লু’ সারের ওপর গবেষণা করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  প্রশিক্ষণের সময় তুরস্কে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও গত কয়েক বছর ধরে ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর সার ব্যবহার বাড়ছে। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো কৃষিপ্রধান দেশেও ন্যানো সার ব্যবহার করা হচ্ছে। আফ্রিকার সেনেগাল, কেনিয়া ও উগান্ডায় কম খরচে ফসল উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশেও বেসরকারি পর্যায়ে ন্যানো সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর ধরে ধান, গম, শাকসবজি ও আমসহ বিভিন্ন ফসলের ওপর ন্যানো ইউরিয়া, ন্যানো ডিএপি, ন্যানো এমওপি ও ন্যানো এনপিকে নিয়ে পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে। এসব পরীক্ষায় কৃষকদের কাছ থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন লেভিট

বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানি করতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। ফলে প্রায় ১৬ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই সার কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষকদের কম দামে সার সরবরাহ করতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়।

ন্যানো সারের অন্যতম সুবিধা হিসেবে কম পরিমাণে ব্যবহার করে তুলনামূলক বেশি কার্যকারিতার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৫০০ মিলিলিটারের একটি ন্যানো ইউরিয়ার বোতল ৫০ কেজির এক বস্তা দানাদার ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এতে কৃষকের খরচও কমতে পারে।

বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো সার ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা ও সরকারি ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রতিবেদনে সরকারি ভর্তুকি প্রায় ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ১২ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩ মরদেহ উদ্ধার

অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া এবং জলাশয়ে দূষণ বাড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ন্যানো সার সরাসরি উদ্ভিদের পাতায় শোষিত হওয়ার কারণে সারের অপচয় ও পরিবেশদূষণ কমানো সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গ্যাস-সংকট, আর্থিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে দেশে কখনো কখনো সার উৎপাদন ও আমদানিতে সংকট দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ন্যানো সার আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তবে ন্যানো সার ব্যাপকভাবে বাজারজাত করার আগে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মাঠপর্যায়ের ফলাফল যাচাই এবং যথাযথ সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।