শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত কলম্বিয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ জনে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) ভোরে কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর থেকেই দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। ভূমিকম্পের ফলে অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, বাড়িঘর, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছু ভবন হেলে পড়েছে এবং বেশ কিছু ভবন পুরোপুরি ধসে গেছে।
মঙ্গলবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শহর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ২৫৪ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে কফি উৎপাদন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ শহর পেরেইরায় ১০১ জন এবং দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালীতে ৯৫ জন নিহত হয়েছেন।
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরমুখী বনাঞ্চলীয় চোকো অঞ্চলের অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় এখনো বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম এসব এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলার শপথ গ্রহণের কয়েক দিন পরই এই ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ঘরবাড়ি হারানো মানুষদের অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দেশটির ন্যাশনাল কফি ফেডারেশনও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশাপাশি কৃষিখামার ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পর সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা ক্রেন, খননযন্ত্র এবং হাতের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক জায়গায় স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকর্মীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছেন এবং আটকে পড়াদের সন্ধান করছেন।
পেরেইরায় স্বামী ও ১০ মাসের শিশুকে নিয়ে একটি অতিথিশালায় ছিলেন রোসা গনজালেজ। ভূমিকম্পের সময় ভবনটি কাঁপতে ও বিকট শব্দ করতে শুরু করলে তারা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। বাইরে যাওয়ার পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে।
রোসা জানান, অতিথিশালায় থাকা প্রায় ২০ জনের মধ্যে মাত্র আটজন জীবিত বের হতে পেরেছেন। একজন বয়স্ক ব্যক্তি ভবনের একটি টেরেসে আটকা পড়েছিলেন। তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রোসা।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার হোসে গায়েগো ভূমিকম্পের সময় পেরেইরা বিমানবন্দরে ছিলেন। তিনি তখন লাইভ ভিডিও করছিলেন। ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনের সময় ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়লে তিনি একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন।
গায়েগো জানান, চারদিকে আহত ও রক্তাক্ত মানুষকে দেখা যাচ্ছিল। অনেকে পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে ছুটছিলেন। ভূমিকম্পের পর তিনি সারা রাত ঘুমাতে পারেননি এবং পরাঘাতের আশঙ্কায় খোলা জায়গায় অবস্থান করেন। মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত প্রায় ১০০টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কালী শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাসিন্দারা রাস্তায় রান্না করছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। ধসে পড়া টোরেস দেল লিমোনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সামনে উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করলে সেখানে উপস্থিত মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েন। পরে তাকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তবে ভয়াবহ এই দুর্যোগে সবার ভাগ্য এতটা ভালো হয়নি। কালী শহরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচিব জার্মান এসকোবার জানিয়েছেন, শহরের মর্গ ইতোমধ্যে মরদেহে পূর্ণ হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপ ও রাস্তায় পড়ে থাকা আরও মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে নেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদকের নাম 









